আজ শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

Logo
শিরোনামঃ
তাবলিগ জামাত বিভক্তির নেপথ্য

তাবলিগ জামাত বিভক্তির নেপথ্য

মুফতি আমানুল হক সংবাদ সম্মলেন বলেন, “তাবলীগ জামাতে বিভক্তির মূল কারণ হল উনারা একজন ব্যক্তিকে (মাওলানা সাদ কান্ধলভী) মেনে চলেন। আর আমরা একটা জামাতকে মেনে চলি।”

তাবলিগ জামাত বিভক্তির নেপথ্য

পল্লী জনপদ ডেস্ক॥

দুই ভাগে বিভক্ত তাবলিগ জামাতে মাওলানা মুহাম্মাদ জুবায়েরের অনুসারীরা তাদের ‘জুবায়েরপন্থি’ না বলতে সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরুর দিন শুক্রবার (০২ ফেব্রুয়ারি) রীতিমত সংবাদ সম্মেলন ডেকে এই অনুরোধ জানান আয়োজক কমিটির মুরুব্বি মুফতি আমানুল হক।

সারা বিশ্বেই তাবলিগ জামাতের বিভক্তি দেখা দিয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান মুফতি আমানুল হক। এ বিষয়ে মাওলানা সাদ অনুসারীদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি (মাওলানা সাদ) সারা বিশ্বের মুরব্বিদের পরামর্শের বাইরে গিয়ে কিছু কাজ করছেন। এর মধ্যে একটি, তিনি নিজেকে আমির দাবি করেছেন। দাওয়াতে তাবলিগে নিজের ইচ্ছাতে আমির হওয়া যায় না। সুরারা মিলে আমির নির্বাচন করেন। কিন্তু তিনি সেটা না করেই নিজেকে আমির দাবি করেছেন। তা ছাড়া তিনি এমন কিছু বিতর্কিত বিষয় উত্থাপন করছেন, যার সঙ্গে আলেম–ওলামারা এক হতে পারেননি। তাই বিরোধ তৈরি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে জেলা প্রশাসক আবুল ফাতেহ মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মূলত নিজেদের জুবায়েরপন্থী বা অনুসারী না বলার আহ্বান জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল প্রথম পক্ষের আয়োজক কমিটি। আমরা তাদের সবরকম সহযোগিতা করেছি।’

উল্লেখ্য, তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের কারণে গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে দুই পর্বে। ঢাকার কাকরাইল মসজিদের খতিব মুহাম্মাদ জুবায়েরের অনুসারীদের অংশগ্রহণে শুক্রবার সকালে ইজতেমার প্রথম পর্বের কার্যক্রম শুরু হয়, যা শেষ হবে রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে।

এরপর ৯ থেকে হবে দ্বিতীয় পর্ব। তাতে অংশ নেবেন দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা। দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাত হবে ১১ জানুয়ারি।

শুক্রবার (০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪) সকালে আমবয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথমপর্ব। ওইদিন বিকেলে ইজতেমা ময়দানে বিদেশিদের ক্যাম্পের পাশে সংবাদ সম্মেলনে এসে মুফতি আমানুল হক তাদের ‘শুরায়ে নিজাম’ কেন বলতে হবে, সেই ব্যাখ্যাও দেন।

তিনি বলেন, “ব্যক্তি কখনো নিরাপদ নয়, তবে পরামর্শ নিরাপদ। তাবলীগ জামাতে বিভক্তির মূল কারণ হল উনারা একজন ব্যক্তিকে (মাওলানা সাদ) মেনে চলেন। আর আমরা একটা জামাতকে মেনে চলি, যারা সকলে মিলে পরামর্শ করেন এবং সেই পরামর্শকে মেনে চলেন।”

আমানুল হকের ভাষ্য, “আমরা মাওলানা জুবায়ের সাবকে ফলো করি না, জুবায়ের সাবসহ একটা জামাত আছে, আমরা সেই জামাতকে মেনে চলি, যারা সকলে মিলে কোনো বিষয়ে পরামর্শ করেন। আমরা সেই পরামর্শকে ফলো করি। সে কারণে আমাদের জুবায়েরপন্থি না বলে ‘শুরায়ে নিজাম’ বললে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।”

অবশ্য অপরপক্ষের মুরুব্বি মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলামের দাবি, মুফতি আমানুল হকের বক্তব্য ‘সঠিক নয়’।

তিনি বলেন, “সাদ সাব নিজেকে নিজে আমির ঘোষণা করেননি। তাদেরও একটি পরামর্শক কমিটি আছে, তারাই তাকে আমির বানিয়েছেন এবং যে কোনো বিষয়ে ওই পরামর্শক কমিটি আমিরকে পরামর্শ দেন। পরে তার বাস্তবায়ন করেন আমির। উনারাই ( জুবায়ের অনুসারী) ইসলাম তথা ধর্ম প্রচার নিয়ে বিতর্ক করছেন।”

সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম ও বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান উপস্থিত ছিলেন।

বিভক্তি কেন?

ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নি মতাবলম্বী মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র বা মারকাজ ভারতের দিল্লিতে। কেন্দ্রীয় ওই পর্ষদকে বলা হয় নিজামউদ্দিন, যার ১৩ জন শুরা সদস্যের মাধ্যমেই উপমহাদেশে তাবলিগ জামাত পরিচালিত হয়।

ভারতের ইসলামি পণ্ডিত ইলিয়াছ কান্ধলভী ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না।

মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় শুরা কমিটি বা নিজামউদ্দিনের ওপর।

সেই শুরা কমিটির সদস্য মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর ইলিয়াছ কান্ধলভীর নাতি মাওলানা সাদ কান্ধলভী নিজেকে আমির ঘোষণা করে একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন।

কিন্তু মাওলানা জুবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান তখন নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের মধ্যেও।

ভারতে দিল্লি মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীদের ওই দ্বন্দ্ব পরে মিটে গেলেও মাওলানা সাদের বিভিন্ন বক্তব্যে বাংলাদেশে তার বিরোধিতা করতে থাকে কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। সাদ বলেছিলেন, যাকাতের পয়সা গরিবদের হক, মাদ্রাসায় ব্যবহার করা যাবে না। তার এরকম আরো বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয় তাবলিগের ভেতরে।

সেই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার সময়। তার আগে কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা সাদ কান্ধলভি সেবার ঢাকায় এসে বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারের মধ্যস্থতায় ইজতেমায় অংশ না নিয়েই তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়।

ওই বছর ডিসেম্বরে পরের ইজতেমায় দুই পক্ষ সংঘাতে জড়ালে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তাতে এক জন নিহত এবং পুলিশসহ অন্তত দুইশ জন আহত হন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইজতেমা ময়দানে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষ সংঘাতে জড়ায়।

পরের বছর থেকে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে দুই ভাগে। দুই পক্ষের অনুসারীরা আলাদা আলাদাভাবে মিলিত হচ্ছেন। পরেও তাদের মধ্যে গণ্ডগোল হয়েছে ঢাকায়।

শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে মুফতি আমানুল হক প্রতিপক্ষের সমালোচনা করে বলেন, “তারা একজন ব্যক্তিকে (সাদ) কেন্দ্র করে চলছে। তিনি দাওয়াতে তাবলীগের কিছু মৌলিক নীতিমালা বর্জন করে মুরুব্বিদের পরামর্শ ছাড়াই যে কোনো বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এককভাবে নিজেকে আমির দাবি করেন।

“দাওয়াতে তবলিগে আমির নিজের দাবিতে হয় না। বরং সকল শুরা সদস্য মিলে আমির নির্বাচিত করেন। কিন্তু নির্বাচনকে না মেনে নিজেকে নিজেই আমির নির্বাচিত করেছেন। আর তৃতীয় হল, তিনি এমন কিছু বিতর্কিত বিষয় উত্থাপিত করেছেন সেগুলোর সঙ্গে ওলামারা একমত পোষণ করতে পারেননি। এটাই তাবলিগ জামাতের বিভক্তির মূল কারণ।”

 

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon