আজ বৃহস্পতিবার, ১৮ Jul ২০২৪, ১২:০৪ পূর্বাহ্ন

Logo

স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৫

 

স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৫

পল্লী জনপদ ডেস্ক॥

ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম, ইসলাম একটি পবিত্র ধর্ম। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব বলেছিলেন যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিযরতের ঘটনার পর থেকে আরবি সন গণনা করা হবে। এতে সকল ধরণের সাহাবীরা মিলে তার দেওয়ার এই প্রস্তাব স্বাগত জানান। তারপর থেকে রাসূল (স.) এর হিজরতের পর থেকে আরবি মাস গণনা করা হয়ে থাকে। সেই মাসকে মহররম বলা হয়। সেই সাথে আজ অবধি প্রচলিত রয়েছে হিজরী সন। হিজরী সনে রয়েছে মোট ১২টি মাস। আরবি মাসকে মূলত হিজরি সন হিসেবে গননা করা হয়ে থাকে।

হযরত মুহাম্মাদ (স.) মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্রের কারণে ৬২২ সালের জুন মাসের শেষের দিকে একান্ত অনুসারী আবু বকর সিদ্দিকীকে সাথে নিয়ে গোপনে মক্কা ছেড়ে মদিনা চলে যান। যা হিজরত নামে পরিচিত। পরবর্তি আরবরা এই হিজরতের সময় থেকে হিজরি সাল গণনা শুরু করেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে হিজরি সন চালু হয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। আরবি সনের উৎপত্তির পূর্বে আরবরা তাদের বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাল, দিন গণনা করতেন।

স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৫। বিদায় ইসলামী আরবি বছর ১৪৪৪। হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। হিজরি সন গণনা করা হয় সন্ধ্যার পর থেকে। পবিত্র কুরআনুল কারিম ও হাদিস শরিফে এ মাসকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। কুরআনের ভাষায় এটি সম্মানিত চার মাসের ‘আরবাআতুন হুরুম’ অন্যতম। এ মাসে রোজা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- এক হাদিসে নবী করিম (স.) বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর কাছে মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ’ (মুসলিম-৩৬৮)।

ইসলামে নতুন বছর পালনের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ আল্লাহর দেয়া প্রতিটি দিনই সুন্দর এবং মঙ্গলময়। আসলে, বর্ষপঞ্জি হচ্ছে জীবনের একটা অপরিহার্য প্রসঙ্গের নাম। দিন, মাস আর সনের হিসাব ছাড়া আধুনিক পৃথিবীতে কোনো কাজই চলে না। আমাদের বাংলাদেশে তিনটি বর্ষপঞ্জির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। সরকারি-বেসরকারি দাফতরিক কাজকর্ম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি একটি অপরিহার্য মাধ্যম। হিন্দু-সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণ, বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণ আর কৃষিজীবীদের আবাদি মৌসুমের হিসাব ছাড়া বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। মুসলমানদের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, শবেবরাত, শবেকদর, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহাসহ ধর্মীয় বিষয়াবলির জন্য হিজরি সনের হিসাব অপরিহার্য। কিন্তু জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় ইংরেজি ও বাংলা সনের বিদায় ও বরণে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয় হিজরি সনের বেলায় তা মোটেও লক্ষ করা যায় না।

অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্বসহকারে পালন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য। যেসব উপাদান মুসলিম উম্মাহকে উজ্জীবিত করে তন্মধ্যে হিজরি সন অন্যতম। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কৃষ্টি-কালচারে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম।
হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্ময়রণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে। রাসূল (স.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তথা দ্বীনের স্বার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসূল (স.) ও সাহাবায়ে কেরামদের হিজরতের বছর থেকেই হিজরি সনের সূচনা। খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মূসা আশআরি রা: ইরাক ও কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একদা হজরত আবু মূসা আশআরি রা: খলিফা ওমর রা:-এর খেদমতে এ মর্মে পত্র লিখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে সমস্যা হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রত বোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে। হজরত আবু মূসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত উমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শসভার আহ্বান করেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শসভায় হজরত উসমান (রা.) হজরত আলী রা:সহ বিশিষ্ট অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই সভায় ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কেউ এ মত পোষণ করেন- রাসূল সা:-এর জন্মের মাস রবিউল আওয়াল থেকে বর্ষ শুরু করার। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন রাসূলের ওফাতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। অন্যান্যের মতে, হুজুর সা:-এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ করা হোক। এভাবে বিভিন্ন মতামত আলোচিত হওয়ার পর হজরত উমর রা: বললেন, হুজুর সা:-এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না। কারণ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা আ:-এর জন্মের মাস থেকেই খ্রিষ্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসূল সা:-এর জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে বাহ্যত খ্রিষ্টানদের অনুসরণ ও সাদৃশ্যতা হয়ে যায়, যা মুসলমানদের জন্য পরিত্যাজ্য। এ সম্পর্কে রাসূলের বাণী- ‘তোমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বিরোধিতা করো’ (বুখারি ও আবু দাউদ শরিফ)।

অপরদিকে, হুজুর সা:-এর ওফাত দিবসের মাস থেকেও গণনা শুরু করা যাবে না, কারণ এতে হুজুর সা:-এর মৃত্যু ব্যথা আমাদের মাঝে বারবার উত্থিত হবে। পাশাপাশি অজ্ঞ যুগের মৃত্যুও শোক পালনের ইসলামবিরোধী একটি কুপ্রথারই পুনরুজ্জীবন ঘটবে। হজরত ওমর রা:-এর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের সাথে হজরত উসমান রা: ও হজরত আলী রা: একবাক্যে সহমত পোষণ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওমর ফারুক রা: হিজরতের বছর থেকেই ইসলামী দিনপঞ্জি গণনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জমাদিউল উলা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে।

মুসলিম জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত ও বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কুরআন কারিমে এ মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘চারটি মাস রয়েছে যেগুলো সম্মানিত মাস। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মহররম (সূরা তাওবাহ-৩৬)। আর এ মাসেই রয়েছে ফজিলতপূর্ণ ‘আশুরা’। মহররমের দশম তারিখে ঐতিহাসিক ‘কারবালা’ সংঘটিত হয়েছিল। এ ছাড়া বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনে ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও এই দিনে আরো অনেক ঘটনা ঘটবে।
মহররমের ফজিলতপূর্ণ অনেক আমল রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নফল রোজা। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসূল (স.)কে এই দিন (আশুরার) এবং এই মাসে রমজানের রোজার চেয়ে অন্য কোনো রোজাকে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। (মিশকাত) রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘আমার বিশ্বাস যে, আশুরার রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা বিগত এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন’ (তিরমিজি)।

হিজরি সন মুসলমানদের সন। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা কাম্য নয়। ইসলামী ফিকাহবিদরা চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কিফায়া বলেছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ এর খবরাখবর রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায় তাহলে প্রত্যেকে গুনাহগার হবে। চান্দ্রমাসের হিসাবের অনুসরণ নবী সা: ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত। যাদের অনুসরণ আমাদের জন্য পুণ্যময় ও কল্যাণকর আমল। হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ: বলেন, সৌর হিসাব রাখা ও ব্যবহার করা একেবারেই নাজায়েজ নয়। বরং এই এখতিয়ার থাকবে, কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, জাকাত, ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সৌর হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু শর্ত হলো- সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। এমন যাতে না হয়, শুধু জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ছাড়া অন্য কোনো মাসই তার জানা নেই। আর হিজরি নববর্ষের মুসলমানরা কোনো আনন্দ উৎসব করবে না, তবে নবী (স.) ও তাঁর সহকর্মীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও মানবতার জন্য ত্যাগ স্বীকার করার শিক্ষা গ্রহণ করবে। হিজরি নববর্ষে মুসলমানদের নব উদ্যমে উদ্যমী হতে হবে। জীবনের সর্বস্তরে ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে।

সবশেষে, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন হিজরি নববর্ষ ১৪৪৫ এর সুন্দর দিনে আমাদেরকে তার সর্বোত্তম বরকত দান করুন। সবাইকে জানাই ইসলামিক নববর্ষের শুভেচ্ছা। শান্তি, রহমত আমাদের চারপাশের সমস্ত খালি জায়গা পূর্ণ করুক। -ছুম্মা আমিন

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon