আজ বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১০:২৮ অপরাহ্ন

Logo
অপরাধীরা কী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকবে? সিংহভাগ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

অপরাধীরা কী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকবে? সিংহভাগ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

 

অপরাধীরা কী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকবে?

সিংহভাগ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

পল্লী জনপদ ডেস্ক॥

দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। প্রতিদিন গণমাধ্যমের খবরে সাবেক এই পুলিশ কর্তার নতুন নতুন অবৈধ সম্পত্তির খবর মিলছে।

এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে শুধুই কি আহমেদ একাই এই সম্পত্তি অর্জন করেছেন? নাকি এখনো যারা দায়িত্বে আছেন তাদের মধ্যেও অনেকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন করছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, সবাই না হলেও সিংহভাগ পুলিশ কর্মকর্তাই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি করছে। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করলেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় পুলিশের অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, “এই দুর্নীতি বন্ধের দায়িত্ব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নির্বাহীদের ওপর বর্তায়। কোনো কারণে তারা শৈথিল্য দেখাচ্ছে বলেই বাহিনীর যারা দুর্নীতি ও অপকর্ম করছে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশের দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে নানামুখী সমালোচনা রয়েছে।

থানার কনস্টবল থেকে শুরু করে শীর্ষ পদ পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির নানা খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও তার বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার দুর্নীতি দমন কমিশন সেই প্রশ্নও রয়েছে।

জবাবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে। যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সাবেক আইজিপি আহমেদের বিরুদ্ধে হঠাৎ নানা তৎপরতা দেখা গেলেও তার ব্যাংকে থাকা টাকা ও কিংবা তার দেশত্যাগ ঠেকাতে দুদকের ভূমিকা নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে।

সেই সাথে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে এখনো যারা পুলিশের পদে থেকে দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে?

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, “ডিআইজি থেকে শুরু করে প্রায় দশজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাদের তদন্ত চলছে।”

পুলিশের যাদের বিরুদ্ধে নজর দুদকের

সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের খবর আসছে গণমাধ্যমগুলোতে।

এরমধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে মামলার রায়ও রয়েছে। কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতির অনুসন্ধান চলছে।

সাবেক আইজিপি মি. আহমেদের দুর্নীতির বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসার পরপরই পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অতিরিক্ত ডিআইজি রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।

পুলিশের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নামে বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। গত বছর তার বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করে দুদক।

গত ২০ মে মেহেদী হাসান নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে দুদকের রাজশাহী কার্যালয়ে মামলা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উত্তম কুমার বিশ্বাসকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত।

সারাদেশের এমন কত সংখ্যক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে সে তথ্য জানাতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন।

তবে, দুদকের অনুসন্ধানের তালিকায় সাবেক ও বর্তমান অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, এসপি, অ্যাডিশনাল এসপি, এএসপি, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের আইনজীবী খান বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ যে আট দশজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতেই অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।”

দুর্নীতির দায়ে পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয় না?

পুলিশের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যে অভিযোগগুলো উঠছে তার মধ্যে যে একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় সেটি হলো থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে অর্থ আদায়।

এসব অভিযোগে ভুক্তভোগীরা অনেকেই থানায় অভিযোগ দেয়। কিন্তু নিজ বাহিনীর বিরুদ্ধে হওয়া অনেক অভিযোগই আড়ালে থেকে যায়।

গত মাসে রাজধানীর মিরপুরে একটি জুতার দোকানের কর্মচারী মো. ফরিদকে মাঝপথে আটকে থানায় নিয়ে যায় শাহ আলী থানার এক এসআই। মাদকের মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাও দাবি করা হয়।

পরে অর্ধেক টাকা দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনে তার পরিবার। গণমাধ্যমের খবরে এমন অভিযোগ প্রায়ই আসছে। কিন্তু এসব অভিযোগে কী ব্যবস্থা নেয় পুলিশ?

মিরপুরের ঐ ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযুক্তকে প্রত্যাহার বা ক্লোজড করেই দায় সারে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, বাহিনীর কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয় সেটিকে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি ইনামুল হক সাগর বলেন, “পুলিশের কেউ দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে গেলে, বা অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা খুব সিরিয়াসলি অনুসন্ধান করি। অভিযোগের সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে সার্ভিস রুলস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়।”

তবে পুলিশ বাহিনীর কতজনের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত চলছে সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এসব অভিযোগ পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন দুদক পর্যন্ত অভিযোগ আসার পর ব্যবস্থা নেয়া হয় সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।

সাবেক পুলিশ প্রধান নূরুল হুদা বলেন, “পুলিশের নিজস্ব আইন আছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আইন আছে, ১৯৭৬ সালের বিশেষ আইনও রয়েছে।” কিন্তু তারপরও কেন ব্যবস্থা নিতে এত ঢিলেমি? সেই প্রশ্নও করেন সাবেক এই পুলিশ কর্তা।

টিআইবি’র গবেষণায় পুলিশের অবস্থান

দেশের সেবা খাতগুলোর মধ্যে দুর্নীতির সার্বিক অবস্থান জানতে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা-টিআইবি দু’তিন বছর পর পর জরিপ করে।

সর্বশেষ ২০২২ সালে যে জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করে টিআইবি। ওই জরিপে দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশকে।

এই তালিকায় বাকি শীর্ষ তিনে থাকা অপর দুটি সংস্থা হলো পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও বিআরটিএ।

টিআইবির ওই জরিপ রিপোর্টে জানানো হয়, জরিপে অংশ নেয়া ৭৪.৪ শতাংশ ‘খানা’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার দুর্নীতির শিকারের কথা জানিয়েছে।

একই বাসস্থানে বসবাস করে, একই রান্নায় খাওয়া-দাওয়া করে এমন পরিবারকে টিআইবি ‘খানা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

টিআইবি বলছে, প্রতি দুই তিন বছর পরপর তারা যখন এই জরিপ করেছে তাতে তারা দেখতে পেয়েছে প্রতিবারই বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের শীর্ষ কিংবা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “হাতে গোনা কয়েকজন বাদে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আপদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। সিংহভাগই দুর্নীতির সাথে জড়িত।”

এই বিশ্লেষক বলছেন, পুলিশের নিম্ন কিংবা মধ্যম মান থেকে শুরু করে অনেক কর্মকর্তাই বিশাল বাড়ি ও ফ্লাটের মালিক হয়েছে। অবৈধভাবে অনেকে সম্পত্তি অর্জন করলেও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশ আইন ও শালিস কেন্দ্রের পরিচালক ফারুখ ফয়সাল বলেন, “দুর্নীতির কথা আমরা অনবরত বলে যাচ্ছি। বেনজীর একটা উদাহরণ, যদি শাস্তি হয় ভালো। কিন্তু তার শাস্তি হবার সম্ভাবনা কম। দেশে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার অবস্থা একেবারেই ভালো না।”

ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে কবে?

দুদকের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শতাধিক দুর্নীতির মামলায় প্রায় ৩৭৪ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের অর্ধেকই সরকারি চাকরিজীবী।

তাদের পরিচয় পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, আসামিদের মধ্যে ৯৬ শতাংশই মধ্যম ও নিম্ন সারির কর্তকর্তা-কর্মচারী। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র চার শতাংশের মতো।

গণমাধ্যমের তথ্য বলছে সাবেক পুলিশ প্রধান আহমেদ অবৈধভাবে এসব সম্পত্তি অর্জন করেছে যখন, তখন তিনি পুলিশ ও র‍্যাবের শীর্ষ ও বিভিন্ন পদে ছিলেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় পুলিশ এসব অপকর্ম করার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আইনের রক্ষক হয়েও পুলিশ বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবের কারণে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পুলিশ অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে।”

সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হওয়া নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তার অপরাধের বিরুদ্ধে যদি সরকার আসলেই আন্তরিক হতো তাহলে তাকে দেশত্যাগের সুযোগ দেয়া হতো না।”

সাবেক পুলিশ প্রধান হুদা বলছেন, “এসব অপরাধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয় না, সেই প্রশ্নে আমার কাছে মনে হয় এক ধরনের অনিচ্ছা রয়েছে ব্যবস্থা নিতে।” প্রশাসনিক পর্যায়ের এই শৈথিল্যটা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলছেন, পুলিশের হাতে যে ক্ষমতা ছিল সেটির অপব্যবহার অনেকে করেছে। কিন্তু অপরাধ করলেও ক্ষমতার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সূত্র : বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon