আজ বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

Logo

আজ পবিত্র আশুরা

 

আজ পবিত্র আশুরা

বিশেষ প্রতিবেদক ॥

আজ পবিত্র আশুরা। আশুরা মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের একটি দিন। কারবালার ‘শোকাবহ এবং হৃদয় বিদারক ঘটনাবহুল’ এই দিনটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে মুসলিম বিশ্বে এ দিনটি গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভির্যের মধ্যদিয়ে নানা-কর্মসূচির মাধ্যমে এবং সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে পবিত্র আশুরা পালিত হচ্ছে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সারাদেশের মসজিদগুলোতে ইমাম ও খতিবরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।

আরবি মহররম মাসের দশম দিবসকে ‘আশুরা’ বলে অভিহিত করা হয়। সৃষ্টির শুরু থেকে মহররমের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত এ দিনটিকে বিশ্ববাসীর কাছে সর্বাধিক স্মরণীয় ও বরণীয় করে রেখেছে। দিনটি উপলক্ষে মুসলমানরা নামাজ, রোজাসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত করে থাকেন। এছাড়া শিয়া সম্প্রদায় তাজিয়া মিছিল বের করে থাকে। আজ সরকারি ছুটির দিন। আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বাণী দিয়েছেন। পবিত্র আশুরার দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়।

হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম (এই দিন) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবার এবং অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। কারবালার ঘটনা স্মরণ করে বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করে থাকে। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তাদের এই আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল রয়েছে। কারবালার শোকাবহ এ ঘটনা অর্থাৎ পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী সবাইকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা জোগায়।

কারবালা সংশ্লিষ্ট ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত সংক্ষেপে জুবাইর ইবনে বাক্কার (রহ.) বলেন, হোসাইন ইবনে আলী (রা.) চতুর্থ হিজরির শাবান মাসের ৫ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। আর আশুরার জুমার দিনে ৬১ হিজরিতে তিনি শহীদ হন।

তাকে সিনান ইবনে আবি আনাস নাখায়ি হত্যা করে। হত্যাকা-ে সহযোগিতা করে খাওলি ইবনে ইয়াজিদ আসবাহি হিময়ারি। সে হোসাইন ইবনে আলীর মাথা শরীর থেকে দ্বিখ-িত করে এবং ওবায়দুল্লাহর দরবারে নিয়ে যায়। বলাবাহুল্য যে, কারবালার প্রান্তরে সে অশুভ দিনে পাপিষ্ঠরা যে নির্মমতা ও নির্দয়তার পরিচয় দিয়েছে, তা পাষ- হৃদয়েও ব্যথা ও যাতনা সৃষ্টি করে।

শাহাদাতের পর হজরত হোসাইন রা:-এর দেহ মোবারকে মোট ৩৩টি বর্শা ও ৩৪টি তরবারির আঘাত দেখা যায়। শরীরে ছিল অসংখ্য তীরের জখমের চিহ্ন। তার সাথে মোট ৭২ জনকে হত্যা করে কারবালার ঘাতকরা।

হোসাইন রা:-এর সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল খিলাফত ব্যবস্থার পুণর্জীবন। ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কুফাবাসীর সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে হোসাইনের রা: স্ত্রী, ছেলে, বোন ও ঘনিষ্ঠ ২০০ অনুচর নিয়ে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা নামক স্থানে পৌঁছলে কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ তাকে বাধা দেন। রক্তপাত ও খুনাখুনি বন্ধের উদ্দেশে হজরত হোসাইন রা: তিনটি প্রস্তাব দেন।

এক. তাকে মদিনায় ফিরে যেতে দেয়া হোক। দুই. তুর্কি সীমান্তের দুর্গে অবস্থান করতে দেয়া হোক। তিন. ইয়াজিদের সাথে আলোচনার জন্য দামেস্কে পাঠানো হোক। কিন্তু ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেন। হজরত হোসাইন (রা.) ঘৃণাভরে তার এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন।

অবশেষে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী হজরত হোসাইন রা:-কে অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং ফোরাত নদীতে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.) এর শিবিরে পানির হাহাকার শুরু হয়। তিনি ইয়াজিদ বাহিনীর উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ‘আমি যুদ্ধ করতে আসিনি, এমনকি ক্ষমতা দখল আমার উদ্দেশ্য নয়। খিলাফতের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার আমার কাম্য। ’

ইয়াজিদ বাহিনী ১০ মুহাররম তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অসম যুদ্ধে একমাত্র হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া ৭০ থেকে ৭২ জন শহীদ হন। হজরত হোসাইন (রা.) মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যান। অবশেষে তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। হজরত হোসাইন (রা.) এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে দামেস্কে পাঠানো হয়। ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে ছিন্ন মস্তক প্রত্যর্পণ করলে কারবালা প্রান্তরে তাকে কবরস্থ করা হয়।

দেশের শিয়া সম্প্রদায় মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন শোক স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করে। আশুরার দিনে তাজিয়া মিছিল বের করা হয় শোকের আবহে। মূলত ইমাম হোসেন (রা.) এর সমাধির প্রতিকৃতি নিয়ে এই মিছিল হয়। আরবি ‘তাজিয়া’ শব্দটি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে ব্যবহার করা হয়। রাজধানীর হোসেনি দালান ইমামবাড়ী থেকে তাজিয়া মিছিল বের করা হবে।

পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও মনীষীদের ভাষ্য মতে, পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলআহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ন ঘটনার অবতারনা হয় আশুরার এ দিনে। সাইয়্যেদিনা হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি, আল্লাহ তায়ালার নিকট তাঁর তওবা গ্রহণ, হযরত নূহ আলাইহিস সালামের মহাপ্লাবন থেকে যুদি পাহাড়ে অবতরন, ফেরাউনের কবল থেকে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের মুক্তি, হযরত আইউব আলাইহিস সালামের কুষ্ট রোগ থেকে আরাগ্য লাভ, এমনকি এই দিনে কিয়ামত সংগঠিত হওয়ার বর্ননাসহ অনেক কারণে এ দিবসকে মুসলিমরা গুরুত্ব দিয়ে ইবাদাত বন্দেগির মধ্যে অতিবাহিত করে থাকেন। এ দিনের রোজার অনেক সওয়াব। হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলআহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট আশা রাখি তিনি এই দিনের রোজার কারণে বিগত এক বছরের গুনাহ মা’ফ করে দিবেন। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon