আজ রবিবার, ২৩ Jun ২০২৪, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন

Logo
আনসারকে গ্রেফতারের অনুমতি দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আনসারকে গ্রেফতারের অনুমতি দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আনসারকে গ্রেফতারের অনুমতি দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পল্লী জনপদ ডেস্ক॥

বাংলাদেশে আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যদের আটকের ক্ষমতা দিতে সংসদে যে বিল উত্থাপন করা হয়েছে তা নিয়ে পুলিশের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলছেন যে আনসারকে গ্রেফতারের অনুমতি আগেও দেয়া হয়নি, এখনও দেয়া হবে না।

যদিও ব্যাটালিয়ন আনসার আইন সংশোধন করে ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার’ ক্ষমতা দেয়ার বিধান রেখেই আনসার ব্যাটালিয়ন আইন ২০২৩ সংসদে উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আছে। সোমবার সংসদে বিলটি উত্থাপন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান নিজেই, যা নিয়ে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

পুলিশের একজন সাবেক আইজিপি বলেছেন নির্বাচনের আগে আনসারকে আটক করার ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাবটি অযৌক্তিক এবং তিনি মনে করে এটিতে নির্বিচারে গ্রেফতারের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা জনগণের ভোগান্তি ও হয়রানি বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করেন তিনি।

সিনিয়র আইনজীবী ডঃ শাহ্দীন মালিক বলছেন সরকার যদি যেভাবে বিল উত্থাপন করেছে তা থেকে সরে আসে, কিংবা যে ধারা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সেটি সংশোধন করে নেয় তাহলে সেটি হবে স্বস্তির বিষয়।

“কারণ যেভাবে উত্থাপন করা হয়েছে সেভাবে পাশ হলে এটি নির্বাচনের সময় বিরোধী দল দমনের জন্য আরও বিশ হাজার লোকের সংখ্যা বাড়াবে মাত্র। পাশাপাশি এর জন্য কত ডজন আইন পরিবর্তন করতে হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই,” বলছিলেন তিনি।

ওদিকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলোই সংসদে উত্থাপিত বিলে আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যদের এ ধরণের ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে। এ সমালোচনার মূল কারণ হিসেবে আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ।

নির্বাচনে আনসার বাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সহায়ক ফোর্স হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তাদের আটকের ক্ষমতা দেয়া হলে সেটি মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করবে এবং বিরোধী দল দমনেও অপব্যবহার হতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিলে কী বলা হয়েছে

বিলটি উত্থাপনের সময় আনসার আইনে পরিবর্তন আনার কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত আনসার ব্যাটালিয়নকে দক্ষ করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছেন। এর উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে তিনি বলেছেন যে ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন আনসার আইন যেটি করা হয়েছিলো সেখানে বিদ্রোহ ও সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধের জন্য শাস্তির কোন বিধান নেই।

এছাড়া অভ্যন্তরীণ জননিরাপত্তা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তাকরণ সহ বিভিন্ন কার্যাবলী সম্পাদনে আনসার ব্যাটালিয়নকে আরও দক্ষ করার প্রয়োজন রয়েছে।

“এছাড়াও বিদ্রোহ সংঘটন সংক্রান্ত অপরাধ বিচারের বিধান অন্তর্ভুক্তকরণ ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাটালিয়ন আনসার আইন ১৯৯৫ এর অধিকতর সংশোধন কল্পে যুগোপযোগী একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা থাকা আনসার ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করা হচ্ছে,” বিলের বিবৃতিতে বলা হয়। কিন্তু বিলটি সংসদে উত্থাপনের পরই এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে বিলের একটি ধারা নিয়ে তৈরি হয় উদ্বেগ।

বিলটিতে ব্যাটালিয়ন সদস্যের এখতিয়ার ও ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, “কোনো ব্যাটালিয়ন সদস্য তার সম্মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে অপরাধ সংঘটনকারীকে আটক করিয়া অবিলম্বে পুলিশের নিকট সোপর্দ করিবে এবং ক্ষেত্র মতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অথবা এতদ উদ্দেশ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশক্রমে উক্ত আটক ব্যক্তির দেহ তল্লাশি, কোন স্থানে প্রবেশ ও তল্লাশি এবং মালামাল জব্দ করতে পারবে”।

বিলটিতে আনসার সদস্যদের আটক করা, তল্লাশি করা কিংবা মালামাল জব্দ করার যে ক্ষমতার কথা এই ধারায় বলা হয়েছে এটি মূলত বাংলাদেশে পুলিশ করে থাকে। এর আগে গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর ‘আনসার ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৩’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলো মন্ত্রিসভা।এতে আনসার ব্যাটালিয়নে বিদ্রোহ সংঘটন ও প্ররোচনাসহ অন্যান্য অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর দুটি ধারায় আনসার বাহিনীকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

‘প্যারালাল বাহিনী তৈরি হবে’

সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করলেও রোববারই পুলিশের আইজিপির নেতৃত্বে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করে প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে যে দুটি ধারায় আনসার বাহিনীকে অপরাধ গ্রেফতার, তল্লাশি বা তদন্তের মতো ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে আপত্তির কথা জানান।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তারা জানান যে তারা মনে করেন আনসার বাহিনী সহায়ক বাহিনী হিসেবে এতদিন যেভাবে কাজ করে আসছিলো সেটিই বহাল রাখা উচিত এবং একই সাথে তারা মনে করেন নতুন প্রস্তাবসহ আইনটি পাশ হলে এটি মাঠ পর্যায়ে আনসার ও পুলিশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু পুলিশের দিক থেকে এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ কী জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি শহীদুল হক সাংবাদিককে বলেন, যে যে ক্ষমতা আইন দ্বারা পুলিশের জন্য নির্ধারিত সেটি কেন আনসারকে দেয়া হবে সেটিই বড় প্রশ্ন।

“ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পুলিশ চলে। পুলিশ ও আদালত সিআরপিসি অনুযায়ী কাজ করে। ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম পুলিশ ও আদালতের কাজের সমন্বয় আছে। আনসারকে সেই ক্ষমতা দিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এটা প্যারালাল বাহিনী তৈরি হবে,” বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, এখন আনসার বাহিনী মূলত সহায়ক ফোর্স হিসেবে পুলিশসহ অন্য বাহিনীগুলোকে সহায়তার কাজ করে। নির্বাচনের সময় তারা মাঠ পর্যায়ে সহায়ক বাহিনী হিসেবে কাজ করে থাকেন। হক বলছেন তড়িঘড়ি করে আনসারকে পুলিশের ক্ষমতা দিতে হলে আইনের ব্যত্যয় হবে এবং মাঠ পর্যায়ে পুলিশ ও আনসারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও সংশয় তৈরি হবে।

“নির্বাচনের আগে এটা করতে হবে কেন? এমন বিভিন্ন বাহিনীকে গ্রেফতারের ক্ষমতা দিলে সাধারণ জনগণ নির্বিচার গ্রেফতারের শিকার হতে পারে। এতে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হবে না। পুলিশের যে কাজে সক্ষমতা আছে সেখানে তার সহায়ক বাহিনীকে সেই কাজ দিলে ভুল বোঝাবুঝির প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। তাই এটা অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক,” বলছিলেন তিনি। পুলিশের ঐ কর্মকর্তা তার নাম না প্রকাশ করার অনুরোধ করে বলেছেন তারা মনে করছেন সরকার বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং আইনটি পাশের আগেই প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন

বুধবার সচিবালয়ে আনসারকে গ্রেফতারের ক্ষমতার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন আনসার বাহিনীকে গ্রেফতারের পারমিশন কখনোই দেয়া হয়নি এবং আজকেও দেয়া হবে না। “ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় সব বাহিনীকে কাজ করতে হবে। এ আইনটি (আনসার ব্যাটালিয়ন) পরীক্ষা নিরীক্ষার শেষ পর্যায়ে। প্রচলিত আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু হলে সেটা সংসদীয় কমিটিতে পরিশুদ্ধ করতে হবে। ভুল বোঝাবুঝির কোন অবকাশ নেই। আনসার পুলিশের ক্ষমতা নিয়ে যাচ্ছে। এগুলো মিস ইনফরমেশন,” বলছিলেন তিনি।

খান বলেন দুটি ফোর্সই (পুলিশ ও আনসার) জাতীয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং। কাররই মুল ল (আইন) এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। “এটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে গেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। সেখানে কোনো শব্দ বা বাক্য যদি এই ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করে, তবে সেগুলো সংশোধন করা হবে। এখানে প্রচলিত আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কোনো নেই”।

তবুও উদ্বেগ কেন

বাংলাদেশে আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ব্যাটালিয়ন আনসারের সদস্য সংখ্যা প্রায় বিশ হাজার। ডঃ শাহদীন মালিক বলছেন এটি পরিষ্কার যে নির্বাচনকে সামনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের জন্য এসব ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন আনসার ব্যাটালিয়নকে গ্রেপ্তারির ক্ষমতা দেয়া হলে তার অপপ্রয়োগ হবে বলেই মনে করেন তিনি।

“সংস্কারের জন্য নতুন আইনটি করা হচ্ছে না। বরং নির্বাচনের সময় বিরোধীদের দমন করার জন্য আরও বিশ হাজার লোককে গ্রেফতারের ক্ষমতা দিতে এটি করা হচ্ছে,” বলছিলেন তিনি। তিনি বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবশেষ যে কথা বলেছেন তার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত ধারাটি সংশোধন করা হল বিষয়টি সবার জন্যই স্বস্তির হবে।

তার মতে পুলিশের মধ্যে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এবং পুলিশের আপত্তির মুখে সরকার এ থেকে সরে আসবে বলেও আশা করেন তিনি। “না হলে আনসারকে এ ধরণের ক্ষমতা (ক্ষমতা, তল্লাশি ও তদন্ত) দিতে হলে কত ডজন আইনে পরিবর্তন করতে হবে তার কোন ইয়ত্তা নেই,” বলছিলেন তিনি। সূত্র : বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon