আজ শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:০৫ পূর্বাহ্ন

Logo
শিরোনামঃ
মা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ২২ দিন

মা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ২২ দিন

মা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ২২ দিন

পল্লী জনপদ ডেস্ক॥

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার্থে ২২ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বুধবার (১১ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের জন্য নিষিদ্ধ হচ্ছে ইলিশ ধরা। যা অব্যাহত থাকবে আগামী ২ নভেম্বর পর্যন্ত। এসময় মাছ ধরা, পরিবহন, বিপণন ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ থাকবে।

মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান চলাকালে আইন লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। বুধবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৩ বাস্তবায়ন উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী একথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আইন অমান্যকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং মা ইলিশ সংরক্ষণের সময়ে কোন মাছ ধরা নৌযান যাতে নদী বা সাগরে যেতে না পারে সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গতবছর মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফলভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ সময়কালে ২২ দিনে প্রায় ৫২ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়তে সক্ষম হয়েছে। ফলে গত বছর প্রায় ৮ লক্ষ ৫ হাজার ৫১৫ কেজি ডিম উৎপাদন হয়েছে যা থেকে প্রায় ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি জাটকা ইলিশ পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কৃষ্টির উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ইলিশ মাছ। বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের ৮০ ভাগের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। দেশে ইলিশ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগত মানে সমৃদ্ধ করা, বড় আকারের ইলিশ উৎপাদন-এর সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন রকম নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাটকা নিধন না করা আর মা ইলিশ সংরক্ষণ। তিনি আরও বলেন, এ বছর ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান পালন করা হবে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর সরকার আরও বেশি তৎপর রয়েছে যাতে মা ইলিশ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

যারা এ সময় ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকবে, তাদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য সরকার ভিজিএফ সহায়তা দিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ৩৭ জেলার ১৫৫ উপজেলায় এ সহায়তা পৌঁছে গেছে। এর আওতায় মোট ৫ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮শ ৮৭ টি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি হারে মোট ১৩ হাজার ৮শ ৭২ দশমিক ১৮ মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।  মন্ত্রী জানান, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের আহরণ ছিল ২ দশমিক ৯৮ লাখ মেট্রিক টন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ইলিশের আহরণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ইলিশ এখন কূটনীতির অংশে পরিণত হয়েছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে সীমিত পরিসরে ইলিশ রপ্তানি হয়ে থাকে। যা প্রতিবেশি দুই দেশের বাণিজ্যিকসহ কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ হাজার ৫শ ৪১ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করা হয়েছে, যা থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ শ ৩৯ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ৩ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। এ পর্যন্ত ৬০৯ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়েছে, যা থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৬২ লাখ মার্কিন ডলার।

ইলিশের দাম বৃদ্ধি সংক্রান্ত সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাছ আহরণের কেন্দ্র থেকে বিপণন পর্যন্ত আরও বেশি কঠোর নজরদারি এবং দেখভাল করা হলে ইলিশের দাম আরও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। এ সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাহিদ রশীদ, অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল কাইয়ূম, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খ. মাহবুবুল হক এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়বেন দুই লাখের অধিক জেলে। যে কারণে অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন তারা। তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে পুনর্বাসনের জন্য প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হবে। সেই চাল নির্ধারিত সময়ে বিতরণের দাবি জেলেদের।ভোলার বিভিন্ন মাছ ঘাট ও জেলে পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, যেহেতু ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, তাই ঘাটে ভেড়ানো হচ্ছে নৌকা-ট্রলার। কেউ কেউ আবার নিষেধাজ্ঞার আগে শেষবারের মতো নদীতে যাচ্ছেন মাছ ধরতে। তবে তাদের ফিরতে হবে আজ রাত ১২টার আগেই। কেউ কেউ আবার আগে থেকেই জাল, নৌকাসহ মাছ ধরার সব উপকরণ তুলে এনেছেন ঘাটে।

সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানতে রাজি থাকলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে দিন কাটাবেন, সে চিন্তার ছাপ রয়েছে জেলেদের চোখে মুখে। তাই নির্ধারিত সময়ে পুনর্বাসনের চাল দ্রুত বিতরণের দাবি জেলেদের। ইলিশা এলাকার জেলে করিব হোসেন বলেন, মাছ ধরা বন্ধ হচ্ছে, তাই জাল নৌকা তীরে এনে রেখেছি। নিষেধাজ্ঞা সময়ে সরকার জেলেদের জন্য যে চাল দেবে, তা দ্রুত বিতরণের দাবি জানাই। আরেক জেলে হান্নান বলেন, এ মৌসুমে তেমন মাছ ধরা পড়েনি, তাই সব ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি। এখন মাছ ধরা বন্ধ হচ্ছে, এতে আবার সংকটে পড়ব। জেলে আবদুর রহিম বলেন, ইলিশ ধরা ২২ দিন নিষেধ, এসময় এনজিওর কিস্তির টাকা আদায় যদি বন্ধ থাকত, তাহলে কিছুটা হলেও ভালো থাকতে পারতাম।

জানা গেছে, ভোলায় নিবন্ধিত এক লাখ ৬৫ হাজার জেলে থাকলেও চাল বরাদ্দ হয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার ৮৯৯ জন জেলের নামে। নিবন্ধিত হয়েও অনেকের ভাগ্যে জুটবে না পুনর্বাসনের চাল, আর তাই অনেক জেলেকেই ধার-দেনা করে দিন কাটাতে হবে। জেলেরা বলছেন, এবার ভরা মৌসুমে ইলিশ কম থাকায় অনেকেই দেনার দায়ে জর্জরিত। এরই মধ্যে আবার ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলে আশায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।জুবায়ের, ফরিদ ও ইলিয়াসসহ অনেকে জেলেই জানান, আয় বন্ধ হয়ে গেছে, সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যাবে। তাই সব জেলেকে চাল দেওয়ার দাবি জানাই।

তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অভিযান চালানো হবে। আর জেলেদের সংকট দূর করতে নিবন্ধিত জেলেদের দেওয়া হবে ২৫ কেজি করে চাল। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লা বলেন, ইলিশ অভিযান সফল হলে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে যাবে। তাই অভিযান সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে, মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে নৌ পুলিশ। তারা বলছে, মা ইলিশ রক্ষায় শক্ত অভিযানের কথা।ভোলা নৌ পুলিশের ইনচার্জ মোঃ আখতার হোসেন বলেন, আমরা নিয়মিত নদীতে অভিযান চালাব। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশসহ কোনো মাছ যাতে কেউ ধরতে না পারে, সেজন্য সার্বক্ষণিক টহল থাকবে। আমরা ঘাটে ঘাটে জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে সচেতনতামূলক সভা এবং লিফলেট বিতরণ করেছি।

আরো জানা গেছে, ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে ইলিশা থেকে মনপুরার চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনার ৯০ কিলোমিটার ও ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। কারণ নদীর এসব পয়েন্ট ইলিশের অন্যতম বিচরণ ক্ষেত্র। নিষিদ্ধ সময়ে এসব পয়েন্টে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষেধ।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon