আজ সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ০৩:০৬ অপরাহ্ন

Logo
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে ভূমিকা : রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুল নানা সমস্যায় জর্জরিত

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে ভূমিকা : রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুল নানা সমস্যায় জর্জরিত

রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুল নানা সমস্যায়  জর্জরিত

 

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে ভূমিকা : রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুল নানা সমস্যায়  জর্জরিত

খোকন আহম্মেদ হীরা, বিশেষ প্রতিবেদক ॥

যথাযথ চর্চা, মাতৃভাষায় শিক্ষা সংকট এবং সংরক্ষণের অভাবসহ নানামুখী সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের সর্বদখিনের জেলা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা। ক্ষয়িষ্ণু এ জাতিসত্তার নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা মুখে ব্যবহার করলেও সচারচার লিখতে বা পড়তে পারছে না। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রচলন নিয়ে শঙ্কিত এ জাতিগোষ্ঠী।

অতিসম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে ২০১৫ সালে কলাপাড়ার মিশ্রিপাড়া লোকাসুক বৌদ্ধ বিহারে প্রতিষ্ঠিত রাখাইন ভাষা শিক্ষা স্কুলটি বর্তমানে জীর্ণ দশায় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একমাত্র অর্থাভাবে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীর এ স্কুলটি এখনও তালপাতার ছাউনি। তাও একপাশ রয়েছে খালি। করোনার সময় থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটির কার্যক্রম নানা সংকটের কারণে এখনও শুরু করা যাচ্ছেনা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মাতৃভাষায় পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে রাখাইন ভাষা শিক্ষা স্কুলটি পরিচালনা করা সম্ভব হবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাখাইন অধিকার আন্দোলনের কর্মী মংম্যায়া জানিয়েছেন, ভাগ্য বিতাড়িত হয়ে ১৭৮৪ সালে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ থেকে বরগুনার জনমানবহীন, জঙ্গলাকীর্ণ তালতলীতে এসে বসতি স্থাপন করে নৃ-জনগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়। পরে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বরগুনার তালতলী এবং পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়ার উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজনে গড়ে তোলে বসতি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায়, ভাষাগত দূরত্বের কারণে দিন দিন তারা (রাখাইন) পিছিয়ে পরছে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা থেকে।

সূত্রমতে, বর্তমানে কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্নস্থানের ২৮টি পাড়ায় প্রায় ৩০৪টির মতো রাখাইন পরিবার বসবাস করে আসছেন। এরমধ্যে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের অদূরের মিশ্রিপাড়া, লহ্মীপাড়া, মম্বিপাড়া, দিয়ারআমখোলা পাড়া, গোড়াআমখোলা পাড়া, থঞ্জুপাড়া, কালাচাঁনপাড়া, নয়াপাড়া, মংথেপাড়া, নাইউরী পাড়া, কেরানীপাড়া, বেতকাটাপাড়া, বৌলতলী পাড়া, নাচনাপাড়া উল্লেখযোগ্য। সূত্রে আরও জানা গেছে, মিয়ানমারের উপভাষা রাখাইন ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত এ জাতিগোষ্ঠীর জন্য শুরু থেকেই মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও এ সম্প্রদায়ের শিশুরা নিজেদের ভাষা পড়তে এবং লিখতে পারছে না। কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র মো. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, শত প্রতিকূলতার মাঝে স্বমহিমায় এখনও টিকে আছে আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা। কেবলমাত্র ব্যক্তি এবং পারিবারিকভাবে তারা সযতেœ লালন করে শুধু মুখে মুখেই টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের মাতৃভাষা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পটুয়াখালীর রাখাইন ভাষায় দুটি উপ-ভাষার প্রচলন রয়েছে। যা আঞ্চলিক ভাবে ‘র‌্যামরা’ এবং ‘মারৌও’ হিসেবে পরিচিত। রাখাইনদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, লৌকিকতা, আচার-আচরণ, প্রথাসহ সবকিছুতেই রয়েছে সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। অন্যান্য প্রথার পাশাপাশি রাখাইনরা তাদের মাতৃভাষার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে নানাভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করে আসছেন।

সূত্রমতে, একসময় রাখাইনদের বসবাস করা প্রায় প্রত্যেকটি পাড়ায় বৌদ্ধ মন্দির ‘কিয়াং’ নির্মাণ করা হয়েছিলো। প্রত্যেকটি কিয়াংয়ে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো। যারা (বৌদ্ধ ভিক্ষুক) প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে রাখাইন শিশুদের নিয়ে টোল ঘরে পাঠশালা খুলে বসতেন। এখানে রাখাইন শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষা এবং ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হতো। প্রতিটি রাখাইন শিশুর জন্য ধর্ম ও মাতৃভাষা চর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। এভাবেই রাখাইনরা তাদের মাতৃভাষার ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছিলেন। কিন্তু গত কয়েক দশকে বৌদ্ধ মন্দির বা কিয়াংয়ের সংখ্যা কমে এসেছে। বর্তমানে বরগুনা ও পটুয়াখালীতে মাত্র পাঁচটি বড় আকারের কিয়াং রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি মাতৃভাষার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাও বন্ধ হয়ে গেছে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরত্বের লতাচাপলি ইউনিয়নের মিশ্রিপাড়া গ্রামে রয়েছে রাখাইনদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক বৌদ্ধ বিহার। এখানে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের প্রতিমা। বলা হচ্ছে, এই মূর্তিটি উপমহাদেশের বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বৌদ্ধ বিহারের সন্নিকটে রয়েছে মুসলমানদের নামাজ আদায়ের জন্য সু-বিশাল জামে মসজিদ। যুগের পর যুগ উভয়ধর্মের লোকজনের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সর্ম্পক। রাখাইন শিশুদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে বৌদ্ধ বিহারের সীমানার ভেরতে ২০১৫ সালে বিনাখরচে রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেন মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারের দায়িত্বরতরা। লোকাসুখ বৌদ্ধ বিহার দরিদ্র ছাত্র উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নামে ওই স্কুলে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হতো। স্কুলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারের প্রধান উত্তম ভিক্ষু। পাশাপাশি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন চানাফরু নামের একজন রাখাইন শিক্ষক।

উত্তম ভিক্ষু বলেন, কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই এতোদিন রাখাইন ভাষা শিক্ষা স্কুলটি পরিচালিত হয়েছে। বর্তমানে এ স্কুলে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে একমাত্র অর্থাভাবে তালপাতার ছাউনীর স্কুল ঘরটি এখন চরম র্জীণদশায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, করোনার সময় থেকে স্কুলের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে অর্থাভাবে জীর্ণদশায় থাকা স্কুলটি পূণরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছেনা। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার অন্যতম আর্কষনীয়স্থান হিসেবে পরিচিত সৌন্দর্য্যে ঘেরা মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারে ঘুরতে আসা পর্যটকরা রাখাইন ভাষা শিক্ষার স্কুলের জন্য সরকারিভাবে একটি পাকা ভবন নির্মানের পাশাপাশি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে রাখাইন সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে বিশ্ব মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রাখাইন আদিবাসীদের ভূমিকা ॥ বাংলাদেশের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাখাইন জনগোষ্ঠীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানা সদরের বাসিন্দা আদিবাসী রাখাইন জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য উ সুয়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কলাপাড়ার আরেকজন সংগ্রামী রাজনীতিক থৈনঅংজাই মাস্টার পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এরা দু’জনেই পরবর্তীতে বাম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী লীগের (ন্যাপ) সাথে সম্পৃক্ত হয়ে এলাকায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এরমধ্যে থৈনঅংজাই মাস্টার স্বাধীনতা সংগ্রামকালে কলাপায়া ও আমতলী থানা সংগ্রাম পরিষদের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাখাইনরা বরগুনা জেলার তালতলী এলাকায় রাখাইনপাড়ায় অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। রাখাইন যুবকরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালন করেছেন। এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা তালতলী থানার আগাঠাকুর পাড়ার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারকে মুক্তিযুদ্ধের স্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তালতলী উপজেলার ঠাকুরপাড়া গ্রামের থয়চা অং মাচ্চীর ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তার ছেলে উসিট মং, অংসিট ও অংথান মং সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এছাড়া কক্সবাজার জেলার টেকনাফের একজন রাখাইন নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন একটি মেডিক্যাল টিমের সদস্য। বরিশালে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পরে বন্দি অবস্থায় তাকে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিলো। একপর্যায়ে ওই রাখাইন নারী পাক সেনাদের সাথে কৌশলে ভাব জমিয়ে তাদের খাবারে বিষ প্রয়োগ করেন। ওই খাবার খেয়ে অনেক পাক সেনার মৃত্যু হয়েছিলো। এছাড়া পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মংছিয়েন নামের এক রাখাইন যুবক শহীদ হয়েছিলেন।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon