আজ বুধবার, ০৩ Jun ২০২৬, ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন
পল্লী জনপদ ডেস্ক ॥
আগামী নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর পাশাপাশি দেশপ্রেমিক বিভিন্ন দল নিয়ে ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, এই ঐক্য গড়তে পারলে আগামী দিনে আমাদের হাতেই আসবে রাষ্ট্রক্ষমতা। আগামীর বাংলাদেশ হবে ইসলামের বাংলাদেশ।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের বিকল্প নেই। আমরা ন্যায়ের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ও তাদের দোসরদের অবিলম্বে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ওই ফ্যাসিবাদের কোনো ক্ষমা নেই। বিগত ৫ আগস্টের পর যে ক্ষেত্র তৈরি হয়ে আমরা সরব না থাকলে আবার ভোটকেন্দ্র দখলের রাজনীতি চালু হবে। এখনই ফসল ঘরে তোলার সময়। ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আগামীর বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত ব্যবসায়ীবান্ধব বাংলাদেশ। কেউ আমাদের দমাতে পারবে না। সংস্কার, বিচার ও পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের দাবি এবং দেশ ও ইসলামবিরোধী সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের প্রতিবাদে শনিবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই এসব কথা বলেন।
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, দুর্নীতি-দুঃশাসনমুক্ত সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য এ দেশের মানুষ শত শত বছর ধরে আত্মত্যাগ করে যাচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তের নজরানা পেশ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাই-আগস্টেও আরেকটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। আমাদের অতীতের আত্মত্যাগ বিফলে গেছে ভুল নীতি এবং অসুস্থ রাজনীতির কারণে। সুতরাং জুলাই অভ্যুত্থানকেও আমরা অতীতের মতো ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। আবু সাঈদ ও মুগ্ধরা আমাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। আহতরা এখনো ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার এখনই করতে হবে। পতিত স্বৈরতন্ত্রের সাথে জড়িতদের বিচার করতে হবে। আরেকটি কথা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করার কোনো বিকল্প নাই। আজকের এই জনসমুদ্র পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের পক্ষের জনসমুদ্র।
মহাসমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার, এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান, ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম, প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীন, এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমাদ আবদুল কাদের, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, এনসিপির সদস্য সচিব মুহাম্মদ আখতার হোসাইন, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল, অধ্যাপক আব্দুল হক আজাদ, মহাসচিব হাফেজ মাওলানা মো. ইউনুস আহমাদ, আল্লামা নূরুল হুদা ফয়েজী, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইজহার, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজি, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানি। সারা দেশ থেকে শত শত যানবাহন যোগে দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা বেলা ১১টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কানায় কানায় ভরে যায়।
পীর সাহেব বলেন, ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধান ছিল দেশের মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও গণআকাঙ্ক্ষাবিরোধী। সেই সংবিধান রচয়িতাদের স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করার ম্যান্ডেটই ছিল না। তারা ভিনদেশের সংবিধান অনুসরণ করেছিলেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত সমৃদ্ধি ও উন্নতি হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতি কলুষিত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলোÑ সংবিধান মেনেই স্বৈরাচার তৈরি হয়েছে। এ জন্যই আমরা সংস্কারের প্রশ্নে অটল-অবিচল ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছি। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বৈরাচারের হাত থেকে রক্ষা করা। ৫৪ বছরের জমা হওয়া জঞ্জাল দূর করা। অভ্যুত্থানের পরে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, মৌলিক সংস্কারে কেউ কেউ গড়িমসি করছেন। এটা জুলাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। স্বৈরাচার তৈরির রাস্তা খোলা রাখা যাবে না। সংস্কার না করেই নির্বাচন আয়োজন করে দেশকে আবারো আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের মূলনীতিসহ সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের মতো বিষয়ে ঐকমত্য না হলে গণভোটের আয়োজন করতে হবে।
পতিত ফ্যাসিস্ট জুলুমের রাষ্ট্র তৈরি করেছিল। হাজার হাজার মানুষকে গুম ও খুন করেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা দেশ থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে। লাখো মানুষকে কারাবন্দি করেছে। চাঁদাবাজি করে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করেছে। আর চব্বিশের জুলাইয়ে তো প্রকাশ্যে গণহত্যা করেছে। ফলে তাদের কোনো ক্ষমা নেই। যারা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের সাথে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে হবে। যারা অপরাধে সহায়তা করেছে, তাদেরও বিচার করতে হবে।
পীর সাহেব বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও পতিত সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি এবং নেতারা এখনো জেলের বাইরে। অনেকেই দেশের বাইরে থেকে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই মহাসমাবেশ থেকে ঘোষণা করছি, অবিলম্বে ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে অতীতের মতোই বাতাসে নানারকম কথা ভাসছে। আমরা আমাদের চোখ কান খোলা রেখেছি। যোগ্যদের বাদ দিয়ে যদি তথাকথিত ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদদের’ নিয়োগ দেয়া হয়, তা কারো জন্যই সুখকর হবে না। আগামী নির্বাচনে সংসদের উভয়কক্ষে অবশ্যই পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দিতে হবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সংসদে তাদের সেই অনুপাতে আসন থাকবে। এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সকলের মতের প্রতিফলন ঘটবে। কোনো দল জালেম হওয়ার সুযোগ পাবে না। এটি এখন জনগণের দাবি। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দাবি। সব ধর্মের মানুষেরও দাবী। গতকালের মহাসমাবেশে আসার জন্য সবাইকে আবারো ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান পীর সাহেব চরমোনাই। মহাসমাবেশে ঘোষণা পাঠ করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।
সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, আমরা পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন চাই। বিএনপি পিআর পদ্ধতির নির্বাচন মানতে চায় না কেন ? আগামীতে জনগণ দুর্নীতিবাজ দখলবাজদের ক্ষমতায় যেতে দিবে না। ভারতের গোলামী আর আমেরিকার দালালি করার জন্য জুলাই বিপ্লবে জনগণ জীবন দেয়নি। আজকের মঞ্চে যারা আছেন যদি মোনাফেকি না করেন তা’ হলে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাবে ইসলাম। মোনাফেকি করবেন না। জনগণ সচেতন। ইসলামপন্থিদের একটি বাক্স দেয়া হলে ইসলামেরই বিজয় হবে। আমি ক্ষমতায় যেতে চাই না ইসলামকে ক্ষমতায় যেতে দিতে চাই। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠায় তিনি সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপরগুরুত্বারোপ করেন। জামায়াত নেতা অধ্যাপক মুজিবর রহমান বলেন, দেশে কুরআনের আইনের পক্ষে যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তা’ কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে কুরআনকে সংসদে পাঠাতে হবে। কুরআন ইসলাম আছে যেখানে আমরা আছি সেখানে। সংসদে কুরআইনের আইন চালু করা হলেই টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ঘরে ঘরে কুরআনের আলে জ্বলে উঠবে। এনসিপির নেতা আক্তার হোসেন বলেন, নতুন বাংলাদেশে কোনো দুর্নীতিবাজ চাঁদাবাজের স্থান হবে না। পিআর পদ্ধতিতেই নির্বাচন দিতে হবে। পিলখানা হত্যা, শাপলা চত্বর হত্যা এবং ২৪- এর জুলাই আগস্টের হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার করতে হবে। দেশি-বিদেশি শক্তি সংস্কার কার্যক্রম দাবিয়ে রাখতে পারবে না। এনসিপি নেতা সার্জিস আলম বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আর কোনো ফ্যাসিস্ট ক্ষমতায় আসতে পারবে না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।