আজ শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫০ অপরাহ্ন
পল্লী জনপদ ডেস্ক ॥
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলটির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং নিবন্ধন স্থগিত থাকলেও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ বা ‘স্পেস’ তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইতোমধ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আত্মগোপনে থেকেও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতির ব্যাপারে লেখালেখি করছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতারা।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির একটি বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী এখনো রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এই শূন্যতাকে কেন্দ্র করেই দলটির জন্য পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার বা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক ভিন্নধর্মী পথ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী দল এবং অন্যান্য বিরোধী শক্তির মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে আওয়ামী লীগের এই ‘নীরব ভোট ব্যাংক’ যে কোনো পক্ষের জন্য বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যদিও দলটির শীর্ষ নেতারা বর্তমানে কারাবন্দি অথবা দেশের বাইরে পলাতক, তবুও তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সমর্থকরা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক সংস্কার এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে কতটুকু অন্তর্ভুক্ত করা হবে বা তারা কীভাবে নিজেদের ‘রিফাইন’ বা সংস্কার করে ফিরে আসবে, তার ওপরই নির্ভর করছে দলটির ভবিষ্যৎ। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নির্বাচনে তাদের সমর্থকদের ভোট প্রদানের প্রবণতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ দলটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের এই নতুন অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নতুন কৌশল সাজাচ্ছে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকা দলটি এখন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই চার স্তরের নির্বাচনে কীভাবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই কৌশল খুঁজছে। তাদের লক্ষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসা।
আত্মগোপনে থাকা এবং দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন চিন্তা-কৌশলের কথা জানা গেছে। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি তাদের আরেকটি লক্ষ্য পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন। বিশেষ করে আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচনে কিছুটা জায়গা তৈরি করতে চায় তারা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের পদ শূন্য হয়ে যায়। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটাকে রাজনৈতিক ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। কারণ, এসব নির্বাচনে ব্যক্তিগত প্রভাব, স্থানীয় নানা ইস্যু এবং দলীয় সমর্থন—সবই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভার্চ্যুয়ালি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্তত দুটি কর্মসূচিতে আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরার তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফিরে আসতে হলে স্থানীয় নির্বাচনে আগে যুক্ত হতে হবে। সে লক্ষ্যেই কারাগারে থাকা নেতা-কর্মীদের জামিনের বিষয়টিতে জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পেশাজীবী সংগঠন, বিশেষ করে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সক্রিয় রয়েছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেলগুলো। গত মাসে কয়েকটি জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফলে দলটি কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৭টি পদের মধ্যে ৭টি পদে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল। যদিও সভাপতি পদে বিএনপি-সমর্থিত এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
এর আগে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতিসহ ১০টি পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে জয়ী হয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরে ৮টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি পদে জয় পেয়েছে।
এসব নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও অংশ নেয়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদগুলোতে বিএনপি বা জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন।
সারা দেশে ৭৪টি আইনজীবী সমিতি রয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ১৪টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ-সমর্থক আইনজীবীরা উল্লেখযোগ্য ফলাফল করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠেয় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আইনজীবী সংগঠনের নির্বাচনে শীর্ষ পদে জয়ের ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী না হলেও অন্যান্য পদে ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীরা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারই। এখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত।
আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলে আওয়ামী লীগের জন্য অংশগ্রহণ সহজ হবে। আর দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবে স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করার সুযোগ থাকবে।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করা আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে তৃণমূলে বিভেদ বেড়েছে এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো একই ভুল করবে না বলেই তাঁদের ধারণা।
সারা দেশে সিটি করপোরেশন আছে ১২টি। এর সব কটিই এখন অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ, যার সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি। উপজেলা রয়েছে প্রায় ৫০০টির মতো এবং পৌরসভার সংখ্যা তিন শতাধিক।
সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়েই এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। গত দেড় বছরের এই শূন্যতায় সেবা পেতে নানা পর্যায়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ ১ মার্চ নির্বাচন ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ঈদের পর থেকে বছরজুড়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে দলীয় প্রতীক নাকি নির্দলীয় প্রতীকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে তার জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ, সেখানে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থাকলেও তা এতটা তীব্র নয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণের পাশাপাশি সাংগঠনিক ও মাঠপর্যায়ের নানা প্রস্তুতি নিতে হয়। ঈদুল ফিতরের পর তাঁরা সেই প্রস্তুতির কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন।