আজ শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪১ অপরাহ্ন

Logo
শিরোনামঃ
‘ইসরাইলি সেনাবাহিনী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে’ : ইরানের হামলায় এশিয়ায় ১৩ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস দৌলতদিয়ায় বাস ডুবি : ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার, অনেকেই নিখোঁজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আজ সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠনের আহ্বান বছর ঘুরে আবারও এলো খুশির ঈদ বাউফলে মাষ্টার মোহাম্মদ ইউনুস বিশ্বাস স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যােগে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরার পথ খুঁজছে আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগ ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’: সংসদের ভাষণে আর যা যা বললেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পবিত্র ইতিকাফ’র গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত
অথৈ পানি, দখিণের জনজীবন বিপর্যস্ত

অথৈ পানি, দখিণের জনজীবন বিপর্যস্ত

অথৈ পানি, দখিণের জনজীবন বিপর্যস্ত

পল্লী জনপদ ডেস্ক ॥

টানা চারদিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, দখিণের জনজীবনে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। বরিশাল ও আশেপাশে চালু রয়েছে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া লঘুচাপের প্রভাবে। এর ফলেই শহরের নবগ্রাম রোড, কাজীপাড়া, বগুড়া রোড, টিটিসি, টিটিসি লেন, অক্সফোর্ড মিশন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

বরিশাল আবহাওয়া অফিসের মতে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় রেকর্ড ১৬০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটি মৌসুমি বায়ুর কারণে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ধরা পড়েছে।

চার দিন ধরে অব্যাহত এই বৃষ্টিপাতের কারণে শহরের নিম্নাঞ্চল থেকে উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো হাঁটু–কোমর পানি ভারী হয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহন ব্যবহার বন্ধ রয়েছে, শিক্ষার্থী ও অফিসজীবীদের বাসায় আটকে পড়তে হয়েছে। এর ফলে অফিস-ব্যাংক বন্ধ, বাজার ও গণপরিবহন বন্ধ, এগুলো একত্রে জনজীবনে চরম অচল অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে রেখেছে। পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতে রাখা হয়েছে লঘুচাপ ও ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায়। মাছ ধরার নৌকাদিগকে উপকূলীয় এলাকায় সাবধানে চলাচল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য খাল ও ড্রেনেজ নালাগুলো খনন এবং অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে। ঢিলেঢালা পরিকল্পনায় একাধিক সময় খাল খনন হয়েছে কিন্তু অ্যালগলযোগ্য কার্যকরী হয়নি।

নগরের খাল, জলাশয় ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রণয়নে টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পূর্বের প্রকল্পগুলো তুলনামূলক ক্ষয়ক্ষতি রোধে না পারায় আবারো পরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি।

এখনো সামান্য হ্রাস পাওয়া বৃষ্টিপাতের কারণে শহরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকরতার কারণে পানি ধীরগতিতে নামছে। আবহাওয়া অফিস আগামী পাঁচ দিনের জন্য মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা অচলাবস্থা পুনরায় সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় পটুয়াখালীতে ২৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা এ জেলার ইতিহাসে একদিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতিপূর্বে এত পরিমাণ বৃষ্টি পটুয়াখালীতে হয়নি। এর আগে ২০২১ সালের জুলাই মাসের ২৭ তারিখ পটুয়াখালীতে একদিনে ২৫১.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিলো।

মঙ্গলবার (৮ জুলাই) রাত নয়টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষক মোঃ রাহাত হোসেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ বিরাজ করায় উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে পটুয়াখালী পৌর শহরের তিতাস মোড়, সবুজবাগ, নতুন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানির নিচে ডুবে গেছে অসংখ্য সড়ক। বিশেষ করে নিচু এলাকার বাসিন্দারা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।

সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা মোসলেম মিয়া বলেন, টানা বৃষ্টিতে আমাদের এলাকার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। হাঁটাচলার অবস্থাও নেই।

জেলার গ্রামাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। সদর উপজেলার বড় বিঘাই এলাকার বাসিন্দা রহিম সিকদার জানান, আমার একটি মাছের ঘের ও একটি পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক মাছ ভেসে গেছে। বড় লোকসান হয়ে গেলো।

আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে জানানো হয়, উত্তাল রয়েছে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর। যে কোন সময় ঝড়ো বা দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে উপকূলীয় এলাকায়। এজন্য দেশের সকল সমুদ্রবন্দরকে ০৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সেই সঙ্গে ঝড়ো বা দমকা হাওয়াও বয়ে যেতে পারে।

এছাড়া পটুয়াখালী, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এ জন্য এসব নদীবন্দরকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ০১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

পটুয়াখালীতে টানা বৃষ্টিপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি অপরিকল্পিত দুর্বল অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহর ও গ্রামে ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

অপরদিকে, গভীর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় এলাকার চার শতাধিক ট্রলার মাছ শিকারের জন্য গভীর সমুদ্রে যেতে পারেনি।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটায় কয়েক হাজার জেলে এখন বেকার সময় কাটাচ্ছেন। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীরাও। স্থানীয় বাজারে দেখা দিয়েছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সংকট।

মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকার গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা আশা করেছিলেন সাগরে গিয়ে ট্রলারভর্তি ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরবেন। ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া সেসব প্রস্তুতিকে হতাশায় পরিণত করেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে ৮ জুলাই সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু এলাকায় ভারী (৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (১৮৮ মিলিমিটার) বৃষ্টিপাত হতে পারে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং বিভিন্ন মহানগরে জলাবদ্ধতার আশঙ্কার কথা জানানো হয় বার্তায়। পাশাপাশি, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেয় আবহাওয়া অধিদপ্তর।

স্থানীয় জেলে ছগির হোসেন, মনির মিয়া, আনিচুর রহমান ও এমাদুল হোসেন জানান, ইলিশের মৌসুমে সরকার অবরোধ দেয়, আর অবরোধ শেষ হতেই শুরু হয় সাগরে নিম্নচাপ। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা সমুদ্রে যেতে পারছেন না। ঝুঁকি নিয়ে যারা গিয়েছিলেন, তারাও খালি হাতে ফিরে এসেছেন। তেল, বরফ ও বাজার খরচ সবই লোকসানে গেছে। প্রতিবছর এমন হলে মাছে-ভাতে বাঙালি পরিচয়টাই হারিয়ে যাবে।

ট্রলার মালিক আবুল হোসেন ফরাজী বলেন, গত এক মাসে আমার তিনটি ট্রলারে ১৪ লাখ টাকার বাজারসামগ্রী নিয়ে সমুদ্রে পাঠিয়েছি। কিন্তু মাছ বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র চার লাখ টাকার। প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমাদের এই পেশা ছাড়তে হবে।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপকূলের চার শতাধিক ট্রলার ঘাটে নোঙর করে অলস সময় কাটাচ্ছে। একদিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে জেলেরা চরম দুরবস্থায় পড়েছেন। গভীর সমুদ্রে ইলিশও কমে যাচ্ছে। প্রতি ট্রিপে ট্রলার মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাছনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon