আজ শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন

Logo
পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি ‘শাবান মাস’

পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি ‘শাবান মাস’

পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি ‘শাবান মাস’

 

পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি ‘শাবান মাস’

বিশেষ প্রতিবেদক ॥

খোশ আমদেদ মাহে রমযান! শাবান মাস মূলত পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতির একটি মাস। তাই এ মাসকে বলা হয় মাহে রমযানের আগমনী বার্তা। প্রতিবছর শাবান মাস মুসলমানদের কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত রমযান মাসের সওগাত নিয়ে আসে।

হিজরি চান্দ্রবর্ষের নবম মাসের আরবি নাম রমাদান ১৪৪৩। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা উচ্চারণে এটি হয় রমযান। রমাদান বা রমযান শব্দের অর্থ হলো প্রচ- গরম, সূর্যের খরতাপে পাথর উত্তপ্ত হওয়া, সূর্যতাপে উত্তপ্ত বালু বা মরুভূমি, মাটির তাপে পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া, কাবাব বানানো, ঘাম ঝরানো, চর্বি গলানো, জ্বর, তাপ ইত্যাদি। রমযানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় রোজাদারের পেটে আগুন জ্বলে; পাপতাপ পুড়ে ছাই হয়ে রোজাদার নিষ্পাপ হয়ে যায়; তাই এ মাসের নাম রমযান। (লিসানুল আরব)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহে আমরা সেই শাবান মাসে প্রবেশ করছি, আলহামদুলিল্লাহ। ইসলাম ধর্মে চন্দ্রমাসের মধ্যে শাবান মাস বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়। বিশ্বনবি ও রাহমাতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাস থেকে মাহে রমযানের পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন। এছাড়া এ মাস থেকে যেন তার উম্মত কল্যাণম-িত হতে পারেন সেজন্য তিনি দোয়াও করতেন।

হাদিস পাঠে জানা যায়, শাবান মাস আসার আগেই মহানবি (স.) দুই হাত তুলে এ দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবাদেরও পড়তে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবাও ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা ইলা শাহরির রমাদান’ (মসনদে আহমদ)। অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রমযান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।

হজরত রাসূল (স.) শাবান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি বেশি নফল রোযা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও নামাজ আদায় করে মাহে রমযানের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘মহানবি (স.) কখনো নফল রোযা রাখতে শুরু করলে আমরা বলাবলি করতাম, তিনি বিরতি দেবেন না। আর রোযার বিরতি দিলে আমরা বলতাম যে, তিনি মনে হয় এখন আর নফল রোযা রাখবেন না। আমি মহানবি (স.) কে রমযান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোযা পালন করতে দেখিনি। কিন্তু শাবান মাসে তিনি বেশি নফল রোযা রেখেছেন’ (মুসলিম)। অপর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে রাসূলুল্লাহ (স.) এত অধিক হারে নফল রোযা আদায় করতেন না’ (বোখারি)।

স্রষ্টার পরে মাখলুকের মধ্যে মহানবি (স.)-এর স্থান প্রথম হওয়ার পরও তিনি রমযানের প্রস্তুতি হিসাবে আগে থেকেই রোযা রাখা শুরু করতেন। বিশ্বনবি (স.) এ মাসে অধিক হারে নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন। এ সম্পর্কে হজরত আনাস (রা.) বলেছেন, মহানবিকে (স.) জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনার কাছে মাহে রমযানের পর কোন মাসের রোযা উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘রমযান মাসের সম্মান প্রদর্শনকল্পে শাবানের রোযা উত্তম’ (তিরমিজি)।

স্বাগত রমযান : রাসুল (স.) বলেন, ‘তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (মুসলিম)। নবী করিম (স.) এভাবে রমযানকে স্বাগত জানাতেন: ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং রমযান আমাদের নসিব করুন।’ (বুখারি)।

রমযানের চাঁদ দেখা : হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন: ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোযা ছাড়ো (ঈদ করো)।’ (বুখারি ও মুসলিম)। তাই চাঁদ দেখা সুন্নত; এটি ইবাদতের প্রতি অনুরাগ ও ভালোবাসার প্রতীক। নতুন চাঁদকে হিলাল বলে। প্রথম তিন দিনে হিলাল বা নতুন চাঁদ দেখলে এই দোয়া পড়া সুন্নত: ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াছ ছালামাতি ওয়াল ইসলাম, রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ; হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, প্রশান্তি ও ইসলাম সহযোগে আনয়ন করুন; আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪০০, রিয়াদুস সালেহীন: ১২৩৬)।

রমযানের মর্যাদা : এ মাসে রোযা রাখা আমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে। রোযা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর ফরজ হয়েছে তা না, অন্যান্য নবির উম্মতের উপরও তা ফরজ ছিল। রোযার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, সংযম-পরহেজগারির মাধ্যমে বান্দার তাকওয়া অর্জন কুরআনে কারীমের ঘোষণা,অর্থ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।’ (সূরা বাকারা-১৮৩)। রমযান মাস কুরআন নাযিলের মাস। কুরআন যেমন মহা মূল্যবান, রমযানও তেমনি মহামর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ইরশাদ, ‘রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে পবিত্র কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

এ মাসটিতে এমন এক রাত রয়েছে, যে রাতে ইবাদত করা হাজার মাস ইবাদত করার চেয়েও বেশি উত্তম। রমযান অত্যন্ত বরকতপূর্ণ মাস। এ মাসে রহমতের অঝোরে বৃষ্টি নেমে আসে জাহান্নাম তালাবদ্ধ হয়। শয়তান আটকে পড়ে। প্রিয় নবীজি (স.) ইরশাদ করেন, ‘রমযান মাস আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারী : ১৮৯৯)। এ মহান মাসে বান্দার জন্য রহমতের দরজা খুলে যায়। হাদিসের ইরশাদ, ‘রমযান মাস আসলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।’ (বুখারী, ১৮৯৮, মুসলিম, ১০৭৯)

মাহে রমযানে দীর্ঘ ৩০টি রোযা পালনের কঠিন কর্মসাধনা সহজভাবে আদায় করার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শাবান মাসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কেননা আমরা যদি রমযান শুরু হওয়ার আগেই শাবান মাসে কয়েকটি নফল রোযা রেখে নেই তাহলে রমযানের রোযা রাখতে আমাদের জন্য অনেক সহজ হবে। এ মাসে বিশেষ কিছু নফল আমল রয়েছে, যা আমল করলে আমরা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম হবে। এছাড়া মুমিন মুত্তাকিরা বরকতপূর্ণ শাবান মাস থেকেই ইবাদতের একটি রুটিন তৈরি করে নেয় যে, পূর্বের রমযান থেকে আগত রমযানে কী কী নেক আমল বেশি করবে।

হাদিসে এসেছে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘মহানবি (স.)-এর প্রিয় মাসের একটি হলো শাবান। এ মাসে নফল রোযা আদায় করেই তিনি মাহে রমযানের রোযা পালন করতেন’ (আবু দাউদ)।

এখন থেকেই নফল ইবাদত ও জিকির-আজকারের অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। যে কোনো জিনিস হঠাৎই খুব বেশি করে ফেলা যায় ন॥ পূর্ব থেকে অভ্যাস থাকলেই যে কোনো কাজ অধিক পরিমাণে করা যায়। এখন থেকে অভ্যাস গড়ে তুললে রমজানে ইবাদত-বন্দেগি বেশি বেশি করা যাবে বলে আশা করা যায়। সুতরাং এখন থেকেই বেশি বেশি ইবাদতের অভ্যাস গড়ে নেওয়া দরকার।

তাই আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করতে শুরু করি, হে পরম দয়াময় আল্লাহ! তুমি আমাকে সুস্থ রাখ, আমি যেন আগত রমযানে আগের তুলনায় অনেক বেশি ইবাদত-বন্দেগি, দানখয়রাত, কুরআন পাঠসহ সব পুণ্যকর্ম অধিকহারে করতে পারি। আমরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহপাকের দরবারে ক্রন্দনরত হয়ে দোয়া করি তাহলে তিনি আমাদের রমযানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করবেন না।

তাই রমযানের কল্যাণ থেকে কল্যাণম-িত হওয়ার জন্য এ শাবান মাস থেকেই আমাদের রমযানের জন্য পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আর না হয় রমযান চলে আসবে আর মনে মনে ভাবব, হায়! রমযান মাস চলে এলো আর আমি এর জন্য তৈরিই হয়নি।

তাই আসুন, পবিত্র মাহে রমযানকে বরণ করতে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করে নিই। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে এ বরকতপূর্ণ শাবান মাসের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে নিজেকে পবিত্র মাহে রমযানের জন্য উপযুক্ত করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017
Developed By

Shipon