আজ সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন
পল্লী জনপদ ডেস্ক ॥
পবিত্র আশুরা মুসলিম বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা মহররম মাসের দশ তারিখে পালিত হয়। আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: প্রথমত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং দ্বিতীয়ত, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট। ঐতিহাসিক দিক থেকে আশুরায় বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, যেমন- আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন ও জান্নাতে স্থান দিয়েছেন, নূহ (আ.) এর মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা, ইব্রাহীম (আ.) এর জন্ম এবং মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ। কারবালার ঘটনা আশুরার প্রেক্ষাপটে একটি শোকাবহ ঘটনা, যা ৬১ হিজরিতে ঘটেছিল এবং এতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। আশুরার দিনে রোজা রাখা এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকার ফজিলত অনেক বেশি।
মুহাররম মাসের সবচে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা মুহাররমের দশ তারিখ। হাদীসে আশুরার দিনের অনেক ফযীলত বিবৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামপূর্ব আরব জাহেলী সমাজে এবং আহলে কিতাব- ইহুদী-নাসারাদের মাঝেও ছিল এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা।
আশুরার দিনে আল্লাহ তায়ালা বান্দার তওবা কবুল করে থাকেন। হাদীসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। হযরত আদম আ. এবং মা হাওয়া আ. যখন বেহেশত থেকে বের হয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। অনিচ্ছাকৃত একটি ভুলের কারণে তারা দুনিয়াতে আসেন। তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে বছরের পর বছর অনুশোচনায় পুড়তে থাকেন। আল্লাহর কাছে তওবা করতে থাকেন। আত-তাগরিব ওয়াত-তারহিব নামক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, মুহাররম মাসের ১০ তারিখ হযরত আদম আ. এর তওবা কবুল করা হয়। এ ঘটনা থেকেও অনুধাবন করা যায় যে, আশুরার দিনে দুয়া কবুল করা হয়। তাই সকলের উচিত, এই দিনে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করা।
হযরত নূহ (আ.) এর নৌকা জুদি পাহাড়ে নোঙর : আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে নূহ আ. এর সময় পৃথিবীব্যাপী বন্যা হয়। সে বন্যায় ঈমানদাররা ব্যতীত সবাই ডুবে মারা যায়। আল্লাহর আদেশে হযরত নূহ আ. তার উম্মতদের নিয়ে একটি নৌকায় আরোহণ করেন। ৪০ দিন পর্যন্ত সেই নৌকায় ঈমানদার-মুসলমানরা ভাসতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহর কুদরতে বন্যার প্লাবণ শেষ হলে, মুহাররমের ১০ তারিখে হযরত নূহ আ. তার উম্মতদের নিয়ে জুদি পাহাড়ে নোঙর করেন। (মুসনাদে আহমাদ)।
হজরত ঈসা (আ.) এর অলৌকিক জন্ম : পৃথিবীর ইতিহাসে এক অভাবনীয় ঘটনার জন্ম দেয় হযরত ঈসা আ. এর পৃথিবীতে আগমন। কোনো পুরুষের সংস্পর্শ ছাড়া কুমারী মাতা হযরত মরিয়াম আ. এর কোলে আসেন এক অলৌকিক সন্তান। ইতিহাস বলে, সেই দিনটিও ছিল মুহাররমের ১০ তারিখ। (আত-তাগরিব ওয়াত-তারহিব)।
এইদিনে অত্যাচারী জালিম শাসক ফেরাউনের হাত থেকে আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে রক্ষা করেন। ফেরাউনের ওপর বিজয় দান করেন। এজন্য এ দিনটিকে মুসলিম মিল্লাতের বিজয়ের দিনও বলা হয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, আর বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্গনকারী হয়ে তাদের পিছু নিলো। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানী করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। আর নিশ্চয়ই অনেক মানুষ আমার নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে গাফেল। (সূরা ইউনুস : ৯০-৯২)।
এ বিজয়ের শোকরিয়াস্বরূপ হযরত মুসা আ. ও তার অনুসারীরা আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। হযরত আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম সা. যখন মদীনায় আগমন করলেন, দেখলেন এদিনে ইহুদীরা রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন দিন যে, তোমরা রোজা রাখছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা আ. ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন ও ফেরআউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)।
পবিত্র আশুরায় তাই প্রার্থনা-সত্যের উজ্জ্বল আলোয় দূর হোক মিথ্যার কালিমা। জয় হোক ন্যায় ও সত্যের।